মঙ্গলবার বিকেলে মাদরাসা মাঠে জনসভায় পৌঁছে প্রথমেই রাজশাহী অঞ্চলের আখচাষিদের প্রণোদনা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ল্যাপটপে তাঁর এক ক্লিকে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষি ১২ কোটি ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা কৃষি প্রণোদনা পান। ‘বিসমিল্লাহ’ বলে বাটন প্রেস করেন তিনি। উপস্থিত জনতাও ‘বিসমিল্লাহ’ বলেন। টাকা চলে যাওয়ার পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত সকলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে ১৫ জন আখচাষিকে প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনার চেক দেন। তারা হলেন- আবু সাঈদ চাঁদ, আবদুল আউয়াল মালেক, আবদুল মান্নান মন্ডল, এমাজ উদ্দিন, মো. কাহার, গোলাম রাব্বানী, সবিতা রানী, জালাল উদ্দিন মৃধা, জিয়াউল হক, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মাজেদ, নিরান্দ কুমার ঘোষ, শামীমুর রহমান, রীমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম।
পরে বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার ঘোষিত উল্লেখযোগ্য সুখবরের মধ্যে রয়েছে— স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা, তিস্তা ও পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করে পানির সমস্যা দূর করা, পানির হিস্যা আদায়ে সর্বোচ্চ জায়গা পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া, ১০টি সুবিধার অন্তর্ভূক্তিতে ৪০ লাখ চাষিকে কৃষক কার্ড প্রদান, বেকারত্ব নিরসনে বন্ধ থাকা ৪৬টি কারখানা চালু করা, অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের লেখাপড়া সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রীর এসব ঘোষণা শুনে নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং জনসভায় ‘হাত উঁচিয়ে’ বিএনপি সরকারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অপপ্রচারসমূহ:
এমপির প্রণোদনা গ্রহণ: অনুষ্ঠানে ১৫ জন আখচাষির হাতে প্রণোদনার চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমে ছিল আবু সাঈদ চাঁদের নাম, যিনি রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির আহবায়ক। বিরোধী দলের নেতারা সংসদ সদস্যকে প্রণোদনার সমালোচনা করছেন। তবে আবু সাঈদ চাঁদ বলেছেন, আমাকে জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমার বাপ-দাদার আমল থেকেই আমাদের পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে আখ চাষ ও আখ সরবরাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিতভাবে আখ চাষসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদন করে আসছি এবং ব্যক্তিগতভাবে রাজশাহী সুগার মিলে শত শত গাড়ি আখ সরবরাহ করছি। এমপি চাঁদ আরও বলেন, এ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য ও দাফতরিক নথিপত্র রাজশাহী সুগার মিল কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে, যা যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা এবং ব্যক্তিগতভাবে আখ চাষ ও সরবরাহ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।
কৃষক কার্ডে বৃৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০টি সুবিধার অন্তর্ভূক্তিতে ৪০ লাখ চাষিকে কৃষক কার্ড প্রদানের ঘোষণা দেন। অন্যতম সুুবিধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন, এখন তো মোবাইল ফোন কমবেশি সবার কাছে আছে, এই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আপনি যদি জানতে চান, আপনি জানতে পারবেন আগামীকাল এখানে বৃষ্টি হবে কি হবে না। তবে বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা ট্রল করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস ও সাবেক শিবির নেতা সালাউদ্দিন আম্মার ব্যঙ্গ করে ভিডিও তৈরি করেছেন। কৃষক কার্ড প্রসঙ্গে জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর উপ-পরিচালক মোস্তাফা কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ সক্রান্ত সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি। পরে কৃষক কার্ড প্রকল্পে সম্পৃক্ত তৌহিদ নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তার মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় শুনে ‘মুখ্য সচিব স্যার ফোন দিয়েছেন, পরে কথা বলব’ বলে ফোন কেটে দেন তিনি। পরে তার নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার আর সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে এ বিষয়ে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) সৈয়দ শাহীন শওকত আল-বায়ান নিউজকে বলেছেন, ‘কোনো কথা তো রূপক অর্থেও ব্যবহার হতে পারে। বাংলাদেশ সিজনাল কান্ট্রি, এখানে ঋতু বৈচিত্র্য আছে। কৃষক কার্ডে যদি উল্লেখ থাকে এ সময়ের জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হবে বা বৃষ্টির জন্য বা কোড নাম্বার ইউজ করে আবহাওয়া অফিসকে কৃষক জানায় যে, এখানে কী হতে পারে। এতে কৃষকরা যদি উপকৃত হয়, তাদের জন্য তো এটা ভাল। এটা তো রূপক অর্থেও ব্যবহার হতে পারে। এটাকে সমালোচনার ইস্যু বানানো, আমি মনে করি এটা ছোট মনের পরিচয় দেওয়া।’
জনগণের অংশগ্রহণ:
বিরোধী দলের নেতারা একটি ড্রোন ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে দাবি করছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। মাদরাসা মাঠই পূর্ণ হয়নি। এত জনপ্রিয় হলে অবশ্যই জায়গা দেওয়া যেত না। সেখানে মাঠই পরিপূর্ণ হয়নি।’
তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, এসব উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে অপপ্রচার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে সবকিছু পরিষ্কার করে গেছেন। সীমানার ওপার থেকে একটি দল এবং দেশের ভেতর থেকে আরেকটি দল চক্রান্ত করছে, তারা এক হয়েছে। সেজন্য এসব অপপ্রচারে কর্নপাত না করে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনার আলোকে জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তারা।
এসব ব্যাপারে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) সৈয়দ শাহীন শওকত আল-বায়ান নিউজকে বলেন, ‘বিরোধী দলের হাতে খেলার মতো কার্ড নাই। সরকারের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাবে কোনো ইস্যু নাই, প্লেয়িং কার্ডই নাই, তাদের রাজনীতিই নাই। কিছু তো বলতে হবে যে, তারা বিরোধী দল। এটা জানান দিতে হবে, এ কারণে তারা এ সমস্ত অপপ্রচার উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলছে।’
সৈয়দ শাহীন শওকত আরও বলেন, ‘যেটা হলো রাজশাহীতে, একটা প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো। গত ১৭ বছর বিভেদ-বিভাজনের বাংলাদেশ ছিল; ভারতীয় সাংবাদিক পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া, গণ্যমান্য ব্যক্তি, তারা পর্যন্ত মন্তব্য করেছে যে, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বাংলাদেশে যেভাবে উদযাপন হলো, সেটা অতীতের ৪৫-৫০ বছরের ইতিহাসে হয়নি। এত উৎসবমুখর প্রাণবন্ত নির্ভয়ে অনুষ্ঠান হলো, সেটা অতীত ইতিহাসে দেখা যায়নি। সেক্ষেত্রে তারা বলল, বাংলাদেশে প্রোগ্রাম হলো ঐক্যের, আর ভারতে হলো বিভাজনের।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘একটা হীনমন্য রাজনীতি আমরা অতীতে দেখেছি। যেখান থেকে তারেক রহমান বের করে আনতে চাচ্ছেন গোটা বাংলাদেশের মানুষকে, বাংলাদেশের রাজনীতিকে। সেক্ষেত্রে অতীতকে নিয়ে কচলাকচলি করার কিছু ইলিমেন্ট তো থাকবেই। বাংলাদেশে তো কিছু স্বভাব চরিত্র বিনা কারণে সমালোচনা করা বিনা কারণে কারো বিপক্ষে বলা এটা তো যাদের চর্চা আছেই। এটা চর্চার অংশ হিসেবে বিরোধী দল এগুলো বলেছে, তারা বলবেই। জনগণ দেখছে, ঐক্যের ও সুন্দর ভবিষ্যতের রাজনীতি করছেন তারেক রহমান। বিরোধী পক্ষ এখানে বিভাজন, কুৎসা রটনা ও সমালোচনা এ ধরণের ইস্যু তৈরি করছে।’
বিএনপির এমপির প্রণোদনা পাওয়া প্রসঙ্গে সৈয়দ শাহীন শওকত বলেন, ‘চাঁদ একজন কৃষক। ট্যাক্স পেয়ার। এমপির বাইরে তিনি একজন মানুষ, কৃষক ও ট্যাক্স পেয়ার ব্যক্তি। সাধারণ কৃষক হিসেবে প্রণোদনা পেয়েছেন। এটা তো সিম্বলিক। এখানে সর্বস্তরের মানুষ, হিন্দুু, মুসলমান, বয়স্ক, ইয়াং সবাই প্রণোদনার আওতায় ছিল। এটা যদি পজিটিভ ধরি, অনেক কিছু তো পাব আমরা এখান থেকে।’
তিনি বলেন, ‘আখ লম্বা সময় ধরে হয়। মাঝখানে জমিটা পতিত থেকে যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জমির মাঝখানের আইল তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, এতে হাজার হাজার বিঘা একর জমি কৃষি জমির মধ্যে সংযুক্ত হয়েছে। যে জমিগুলো পড়ে থাকে, আবাদি করার জন্য ফসল উৎপাদনের জন্য উপযুক্ত করা হবে। আখের পাশাপাশি ডাল আলু ইত্যাদি হবে। এভাবে কৃষকরা লাভবান হবে। কৃষকদের সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই এ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।’
সবশেষ বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে বিএনপির এ কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘সরকারের এসব কার্যক্রমের প্রশংসা করার কথা। বিরোধী দল হলেই যে সমালোচনা করতে হবে অপপ্রচার চালাতে হবে এটা তো না। বিরোধী দলের পজিটিভভাবে দেখা উচিত, দৃৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা উচিত। স্বভাবগত যে চরিত্র আমরা দেখেছি অতীতে, সেখান থেকে বের হয়ে আসা উচিত। হাসিনার আমলে যে কার্যকলাপ ছিল; অপপ্রচার, সমালোচনা, মিথ্যা কথা বলা, বিভেদ-বিভাজন তৈরি করা, সেই কালচার থেকে বের হওয়ার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
এ বিষয়ে রাজশাহী রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আশিক সাঈদ আল-বায়ান নিউজকে বলেন, ‘যারা অপপপ্রচার করছে বা গুজব ছড়াচ্ছে, আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। সাইবার অপরাধে যদি মামলা করা লাগে, আমরা সে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমরা তাদেরকে আইডেন্টিফাই করছি।’